বায়োডাটা গাইড
বিয়ের বায়োডাটা ফরমেট: কী কী লিখবেন (নমুনাসহ)
সহজ বিয়ে · হালনাগাদ: · পড়তে লাগবে প্রায় ৭ মিনিট
বিয়ের কথা শুরু হলে প্রথমেই যে কাগজটি চাওয়া হয়, তা হলো বায়োডাটা। পাত্র বা পাত্রীর পরিবার এই এক-দুই পাতা পড়েই ঠিক করেন, কথা আরও এগোবে কি না। তাই বায়োডাটা হওয়া চাই পরিষ্কার, গোছানো আর সত্য।
অনেকে একে ইংরেজিতে ‘marriage biodata’ বা ‘biodata for marriage’ বলেন। নাম যা-ই হোক, কাজ একটাই: অল্প কথায় নিজের ও পরিবারের পরিচয় তুলে ধরা। এই লেখায় অংশ ধরে ধরে দেখানো হয়েছে কী লিখবেন, কী লিখবেন না। শেষে আছে একটি পূরণ করা নমুনা।
অংশ অনুযায়ী কী লিখবেন
বাংলাদেশে প্রচলিত বায়োডাটায় সাধারণত নিচের অংশগুলো এই ক্রমেই থাকে। সব ঘর পূরণ করা জরুরি নয়। তবে যেটুকু লিখবেন, তা যেন সত্য আর স্পষ্ট হয়।
১. শিরোনাম ও ছবি
সবার ওপরে লিখুন ‘পাত্রের বায়োডাটা’ বা ‘পাত্রীর বায়োডাটা’। ছবি দেওয়া ঐচ্ছিক। অনেক পরিবার প্রথমে ছবি ছাড়া বায়োডাটা পাঠায়, আগ্রহ বোঝা গেলে পরে ছবি দেয়। ছবি দিলে সাম্প্রতিক, পরিষ্কার আর শালীন ছবি দিন।
২. সাধারণ তথ্য
জন্মের মাস ও বছর, উচ্চতা, গাত্রবর্ণ, ওজন, রক্তের গ্রুপ, জাতীয়তা আর বৈবাহিক অবস্থা লিখুন। বয়সের বদলে জন্মের মাস ও বছর লিখলে বায়োডাটা পুরোনো হলেও বয়স ভুল দেখায় না। উচ্চতা ফুট-ইঞ্চিতে লিখুন, যেমন ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। আন্দাজে না লিখে একবার মেপে নিন।
৩. ঠিকানা
স্থায়ী ঠিকানায় জেলা আর উপজেলা বা থানা যথেষ্ট। এখন কোথায় থাকেন, যেমন ঢাকা বা সৌদি আরব, সেটাও লিখুন। বাড়ির নম্বর বা রাস্তার নাম দেওয়ার দরকার নেই। কথা এগোলে পরিবার নিজেরাই জেনে নেবে।
৪. শিক্ষাগত যোগ্যতা
শিক্ষার ধরন (জেনারেল, কওমি বা আলিয়া), সর্বোচ্চ ডিগ্রি, বিষয় আর প্রতিষ্ঠানের নাম লিখুন। হাফেজ, মাওলানা বা মুফতির মতো দ্বীনি যোগ্যতা থাকলে আলাদা করে উল্লেখ করুন। পড়াশোনা চলমান থাকলে কোন বর্ষে আছেন, তা লিখে দিন।
৫. পেশা
কী কাজ করেন আর কোথায় করেন, তা এক-দুই লাইনে লিখুন। মাসিক আয় লেখা ঐচ্ছিক। লিখতে চাইলে সঠিক অঙ্ক দিন, বাড়িয়ে লিখবেন না। প্রবাসী হলে কোন দেশে আছেন আর কী কাজ করেন, তা স্পষ্ট করুন।
৬. পারিবারিক তথ্য
বাবা-মা জীবিত কি না ও তাঁদের পেশা, ভাই-বোন কতজন, কে কী করেন আর কার বিয়ে হয়েছে, এগুলো লিখুন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা (যেমন মধ্যবিত্ত) আর দ্বীনি পরিবেশ নিয়ে দুই-এক লাইন লিখলে অন্য পরিবার সহজে নিজেদের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।
৭. দ্বীনি ও ব্যক্তিগত তথ্য
নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, মাযহাব আর মাহরাম-নন মাহরাম মেনে চলেন কি না, এগুলো সৎভাবে লিখুন। পাত্র হলে দাড়ি আর পাত্রী হলে পর্দার কথা লিখুন। দ্বীনদার পরিবার এই অংশটি সবচেয়ে মন দিয়ে পড়ে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “চারটি বিষয় দেখে নারীকে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারি। সুতরাং তুমি দ্বীনদারিকেই প্রাধান্য দাও, নইলে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
শারীরিক বা মানসিক কোনো অসুস্থতা থাকলে সংক্ষেপে জানিয়ে দিন। শুরুতে জানালে পরে আস্থা নষ্ট হয় না। ‘নিজের সম্পর্কে কিছু কথা’ অংশে তিন-চার লাইনে নিজের স্বভাব, পছন্দ আর লক্ষ্যের কথা লিখুন।
৮. বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য
অভিভাবক এই বিয়েতে রাজি কি না, তা লিখুন। তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা বা বিপত্নীক হলে আগের বিয়ের সংক্ষিপ্ত তথ্য দিন: কবে হয়েছিল, কবে শেষ হয়েছে আর কারণ এক লাইনে। কারও দোষ খোঁজার দরকার নেই, শুধু সত্যটা জানালেই হয়। সন্তান থাকলে সংখ্যা, বয়স আর কার কাছে থাকে, তা লিখুন।
পাত্রী হলে বিয়ের পর পড়াশোনা বা চাকরি চালাতে চান কি না, তা লিখুন। পাত্র হলে স্ত্রীকে সেই সুযোগ দেবেন কি না আর বিয়ের পর কোথায় থাকবেন, তা লিখুন। আগে থেকে জানা থাকলে পরে মতের অমিল কম হয়।
বিবাহিত পাত্র আবার বিয়ে করতে চাইলে বর্তমান স্ত্রীর সংখ্যা আর কারণ লিখুন। মনে রাখবেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী আবার বিয়ের আগে সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি নিতে হয়।
৯. প্রত্যাশিত জীবনসঙ্গী
কেমন জীবনসঙ্গী চান, তা লিখুন: বয়সের সীমা, শিক্ষা, জেলা, পেশা আর বৈবাহিক অবস্থা। শেষে দুই-তিন লাইনে মূল গুণগুলো লিখুন, যেমন ‘নামাজি, পরিবারকে সম্মান করেন’। খুব লম্বা শর্তের তালিকা দিলে ভালো প্রস্তাবও ফিরে যেতে পারে।
১০. যোগাযোগ
অভিভাবকের নাম, তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক আর তাঁর মোবাইল নম্বর দিন। প্রস্তাব অভিভাবকের মাধ্যমে আসাই ভালো। নিজের নম্বর দেওয়া ঐচ্ছিক। বায়োডাটা কোথাও পোস্ট করার আগে ভেবে দেখুন, এই নম্বর কারা দেখতে পাবে।
একটি নমুনা বায়োডাটা
নিচের নমুনার সব তথ্য কাল্পনিক, শুধু বোঝানোর জন্য। নাম আর নম্বরের জায়গায় আপনার নিজের তথ্য বসবে।
| সাধারণ তথ্য | |
|---|---|
| বায়োডাটার ধরন | পাত্রের বায়োডাটা |
| বৈবাহিক অবস্থা | অবিবাহিত |
| জন্ম মাস ও বছর | জানুয়ারি ১৯৯৬ |
| উচ্চতা | ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি |
| গাত্রবর্ণ | উজ্জ্বল শ্যামলা |
| রক্তের গ্রুপ | B+ |
| ঠিকানা | |
| স্থায়ী ঠিকানা | টাঙ্গাইল সদর, টাঙ্গাইল |
| বর্তমান ঠিকানা | মিরপুর, ঢাকা |
| শিক্ষা ও পেশা | |
| শিক্ষার ধরন | জেনারেল |
| সর্বোচ্চ শিক্ষা | স্নাতকোত্তর (হিসাববিজ্ঞান) |
| পেশা | বেসরকারি চাকরি, একটি ব্যাংকে কর্মকর্তা |
| পারিবারিক তথ্য | |
| বাবা | জীবিত, অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক |
| মা | জীবিত, গৃহিণী |
| ভাই-বোন | এক ভাই (ছাত্র), এক বোন (বিবাহিত) |
| আর্থিক অবস্থা | মধ্যবিত্ত |
| দ্বীনি তথ্য | |
| নামাজ | ৫ ওয়াক্ত নিয়মিত |
| কুরআন তিলাওয়াত | শুদ্ধভাবে পারি |
| মাযহাব | হানাফি |
| দাড়ি | সুন্নতি দাড়ি |
| বিয়ে ও প্রত্যাশা | |
| অভিভাবক কি রাজি? | হ্যাঁ |
| স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে দেবেন? | হ্যাঁ |
| প্রত্যাশিত বয়স | ২২ থেকে ২৭ বছর |
| প্রত্যাশিত গুণ | নামাজি, পর্দা করেন, পরিবারকে সম্মান করেন |
| যোগাযোগ | |
| পূর্ণ নাম | (এখানে আপনার নাম) |
| অভিভাবক | বাবা, ০১৭XXXXXXXX |
সহজ বিয়ে-এর মেকারে ঠিক এই অংশগুলোই ক্রম অনুযায়ী সাজানো আছে। ঘর পূরণ করলেই এমন বায়োডাটা তৈরি হয়ে যায়।
যা করবেন, যা করবেন না
যা করবেন
- সত্য তথ্য দিন, নিজের কথায় লিখুন।
- বয়সের বদলে জন্মের মাস ও বছর লিখুন।
- আগের বিয়ে, সন্তান বা অসুস্থতার কথা শুরুতেই জানান।
- পাঠানোর আগে পুরোটা একবার পড়ে বানান দেখে নিন।
- এক থেকে দুই পাতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।
যা করবেন না
- আয়, উচ্চতা বা পদবি বাড়িয়ে লিখবেন না।
- শর্তের লম্বা তালিকা চাপিয়ে দেবেন না।
- যৌতুক বা ‘উপহার’-এর কোনো ইঙ্গিত দেবেন না। যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া দুটোই আইনে অপরাধ।
- অন্যের ছবি বা তথ্য দিয়ে বায়োডাটা বানাবেন না।
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা ব্যাংকের তথ্য দেবেন না।
গোপনীয়তা রক্ষায় কয়েকটি পরামর্শ
বায়োডাটা অনেক হাত ঘুরে যায়। তাই কিছু তথ্য সাবধানে দিন।
- মোবাইল নম্বর শুধু ‘যোগাযোগ’ অংশে দিন, অন্য কোনো ঘরে নয়।
- পুরো বাড়ির ঠিকানা নয়, জেলা আর উপজেলাই যথেষ্ট।
- ছবিসহ বায়োডাটা শুধু বিশ্বস্ত মানুষের কাছে পাঠান। Facebook গ্রুপে পোস্ট করা ছবি কোথায় চলে যাবে, তার ওপর আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
- সহজ বিয়ে-এর তালিকায় প্রকাশ করলে নাম, মোবাইল নম্বর আর ছবি কখনো দেখানো হয় না। প্রস্তাব আসে অভিভাবকের মাধ্যমে।
- প্রকাশের পর পাওয়া ব্যবস্থাপনার লিংকটি সংরক্ষণ করুন। এই লিংক দিয়ে যেকোনো সময় বায়োডাটা লুকাতে বা মুছে ফেলতে পারবেন।
PDF, ছবি না প্রিন্ট?
আত্মীয়দের ইমেইলে পাঠাতে বা কাগজে ছাপাতে চাইলে PDF ভালো। এতে লেখা ঝকঝকে থাকে আর A4 কাগজে ঠিকঠাক ছাপা হয়। লেখা লম্বা হলে PDF নিজে থেকেই একাধিক পাতায় ভাগ হয়। WhatsApp বা Messenger-এ পাঠাতে ছবি (PNG) বেশি সুবিধাজনক, কারণ ফোনে খুললেই দেখা যায়।
সাধারণ প্রশ্ন
বিয়ের বায়োডাটা কত পাতার হওয়া উচিত?
এক থেকে দুই পাতাই যথেষ্ট। দরকারি সব তথ্য থাকুক, কিন্তু লম্বা গল্প নয়। বাকি কথা দুই পরিবার আলাপ করে জেনে নেবে।
বায়োডাটা বাংলায় লিখব, নাকি ইংরেজিতে?
যাঁদের কাছে পাঠাবেন, তাঁরা যে ভাষা সহজে পড়েন, সেই ভাষায় লিখুন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবার বাংলায় পড়তে স্বচ্ছন্দ। সহজ বিয়ের মেকার বাংলায় বায়োডাটা তৈরি করে।
বায়োডাটায় ছবি দেওয়া কি জরুরি?
না, ছবি ঐচ্ছিক। অনেক পরিবার প্রথমে ছবি ছাড়া বায়োডাটা পাঠায়, আগ্রহ বোঝা গেলে পরে ছবি দেয়। সহজ বিয়ের মেকারে ছবি দিলে তা শুধু আপনার ফোনে থাকে, কোথাও আপলোড হয় না।
তালাকপ্রাপ্ত হলে বায়োডাটায় কী লিখব?
বৈবাহিক অবস্থায় ‘তালাকপ্রাপ্ত’ লিখুন, আর আগের বিয়ের সময় ও কারণ এক-দুই লাইনে দিন। সন্তান থাকলে তাদের বয়স আর কার কাছে থাকে, তা জানান। সত্যটা শুরুতে জানালে সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
বায়োডাটা কি Word ফাইলে বানাতে হবে?
না। সহজ বিয়ের মেকারে ফর্ম পূরণ করলেই A4 মাপের PDF তৈরি হয়। Word বা কম্পিউটার লাগে না, মোবাইলেই পুরো কাজ হয়ে যায়।